শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চান্দিনার আহবায়ক কমিটি গঠন বুড়িচংয়ে পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহতের ঘটনায় দুই নারী গ্রেপ্তার, মামলা দায়ের চান্দিনায় তিন ফসলি জমি ও পুকুর ধ্বংসের মহোৎসব; সিন্ডিকেটের নেপথ্যে জনপ্রতিনিধি-বিএনপি নেতা চান্দিনা ও বুড়িচং কৃষকলীগ যুবলীগ নেতাসহ দুই উপজেলায় গ্রেফতার ১২ জনদুর্ভোগ কমাতে চান্দিনা বাজারে উচ্ছেদ অভিযান, দখলমুক্ত হলো প্রধান সড়ক হাদি হত্যা: বিচার ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ইনকিলাব মঞ্চের ব্রাহ্মণপাড়ায় স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বিএনপি নেতাদের জুয়ার আসর, ভিডিও ভাইরাল প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি, ৭ ঘণ্টা বন্ধ ছিল হটলাইন চান্দিনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৬ জন গ্রেপ্তার, আদালতে প্রেরণ চান্দিনায় সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহে ভোগান্তি

দাম নেই, ক্রেতা নেই-চান্দিনায় সড়কের পাশে পচছে কোরবানির চামড়া

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কুমিল্লার চান্দিনাতেও জমে উঠার কথা ছিল কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার। তবে বাস্তবে এবার দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আড়তভিত্তিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ, ক্রেতা সংকট, শ্রমিক স্বল্পতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় পুরো চামড়া খাতজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৌসুমি সংগ্রাহক, এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো।

সরেজমিনে দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ চামড়ার আড়ত ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপভর্তি কাঁচা চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাচ্ছেন না। আড়তের ভেতরে ও বাইরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার গরু ও ছাগলের চামড়া। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকটের কারণে আড়তদাররা চামড়া নামাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় ব্যবসায়ীদের নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি থেকে চামড়া নামাতে হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহে উৎসাহিত করা হলেও আড়তে পৌঁছানোর পর কৃত্রিমভাবে ক্রেতা সংকট তৈরি করে দাম কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকের দাবি, ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় সংগ্রহ করা গরুর চামড়া আড়তে এসে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। এতে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

চান্দিনা পৌরসভা, মাধাইয়া ইউনিয়ন ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিক্রি না হওয়া চামড়া খোলা মাঠ, বাজারের পাশে ও মহাসড়কের ধারে ফেলে রাখা হয়েছে। সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের অভাবে এসব চামড়ায় পচন ধরছে। তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

চান্দিনা পৌরসভা এলাকার এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, “লাভের আশায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কিনেছিলাম। এখন আড়তে কোনো দাম নেই। শেষ পর্যন্ত চামড়া ফেলে দিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারিভাবে মাদ্রাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ সরবরাহ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সেই লবণের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। ফলে সংরক্ষণে অবহেলার কারণে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

See also  বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই

এ সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলোতে। প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর এতিম শিশুদের ভরণপোষণ, শিক্ষক বেতন ও অন্যান্য খরচের একটি অংশ নির্বাহ করা হয়। কিন্তু এবার কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশা বিরাজ করছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

চান্দিনার এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, “চামড়ার টাকাই ছিল আমাদের বড় ভরসা। এবার সেই টাকা তো দূরের কথা, উল্টো পরিবহন খরচ নিয়েই চিন্তায় পড়তে হয়েছে।”

তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন স্থানীয় আড়তদাররা। তাদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের কম চাহিদা, আগের পাওনা বকেয়া থাকা এবং কেন্দ্রীয় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়নি বলেও দাবি তাদের।

এদিকে সড়কের পাশে ফেলে রাখা পচা চামড়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সচেতন মহল বলছে, সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করা, বাজারে তদারকি বাড়ানো এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চামড়া শিল্পে এমন অস্থিরতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

Tag :
জনপ্রিয়

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চান্দিনার আহবায়ক কমিটি গঠন

দাম নেই, ক্রেতা নেই-চান্দিনায় সড়কের পাশে পচছে কোরবানির চামড়া

২৯ মে ২০২৬, ১১:৫২

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কুমিল্লার চান্দিনাতেও জমে উঠার কথা ছিল কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার। তবে বাস্তবে এবার দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আড়তভিত্তিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ, ক্রেতা সংকট, শ্রমিক স্বল্পতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় পুরো চামড়া খাতজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৌসুমি সংগ্রাহক, এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো।

সরেজমিনে দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ চামড়ার আড়ত ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপভর্তি কাঁচা চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাচ্ছেন না। আড়তের ভেতরে ও বাইরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার গরু ও ছাগলের চামড়া। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকটের কারণে আড়তদাররা চামড়া নামাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় ব্যবসায়ীদের নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি থেকে চামড়া নামাতে হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহে উৎসাহিত করা হলেও আড়তে পৌঁছানোর পর কৃত্রিমভাবে ক্রেতা সংকট তৈরি করে দাম কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকের দাবি, ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় সংগ্রহ করা গরুর চামড়া আড়তে এসে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। এতে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

চান্দিনা পৌরসভা, মাধাইয়া ইউনিয়ন ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিক্রি না হওয়া চামড়া খোলা মাঠ, বাজারের পাশে ও মহাসড়কের ধারে ফেলে রাখা হয়েছে। সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের অভাবে এসব চামড়ায় পচন ধরছে। তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

চান্দিনা পৌরসভা এলাকার এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, “লাভের আশায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কিনেছিলাম। এখন আড়তে কোনো দাম নেই। শেষ পর্যন্ত চামড়া ফেলে দিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারিভাবে মাদ্রাসাগুলোকে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ সরবরাহ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সেই লবণের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। ফলে সংরক্ষণে অবহেলার কারণে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

See also  জনদুর্ভোগ কমাতে চান্দিনা বাজারে উচ্ছেদ অভিযান, দখলমুক্ত হলো প্রধান সড়ক

এ সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলোতে। প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর এতিম শিশুদের ভরণপোষণ, শিক্ষক বেতন ও অন্যান্য খরচের একটি অংশ নির্বাহ করা হয়। কিন্তু এবার কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশা বিরাজ করছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

চান্দিনার এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, “চামড়ার টাকাই ছিল আমাদের বড় ভরসা। এবার সেই টাকা তো দূরের কথা, উল্টো পরিবহন খরচ নিয়েই চিন্তায় পড়তে হয়েছে।”

তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন স্থানীয় আড়তদাররা। তাদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের কম চাহিদা, আগের পাওনা বকেয়া থাকা এবং কেন্দ্রীয় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়নি বলেও দাবি তাদের।

এদিকে সড়কের পাশে ফেলে রাখা পচা চামড়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সচেতন মহল বলছে, সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করা, বাজারে তদারকি বাড়ানো এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চামড়া শিল্পে এমন অস্থিরতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।