শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চান্দিনার আহবায়ক কমিটি গঠন বুড়িচংয়ে পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহতের ঘটনায় দুই নারী গ্রেপ্তার, মামলা দায়ের চান্দিনায় তিন ফসলি জমি ও পুকুর ধ্বংসের মহোৎসব; সিন্ডিকেটের নেপথ্যে জনপ্রতিনিধি-বিএনপি নেতা চান্দিনা ও বুড়িচং কৃষকলীগ যুবলীগ নেতাসহ দুই উপজেলায় গ্রেফতার ১২ জনদুর্ভোগ কমাতে চান্দিনা বাজারে উচ্ছেদ অভিযান, দখলমুক্ত হলো প্রধান সড়ক হাদি হত্যা: বিচার ও আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ইনকিলাব মঞ্চের ব্রাহ্মণপাড়ায় স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বিএনপি নেতাদের জুয়ার আসর, ভিডিও ভাইরাল প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি, ৭ ঘণ্টা বন্ধ ছিল হটলাইন চান্দিনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৬ জন গ্রেপ্তার, আদালতে প্রেরণ চান্দিনায় সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহে ভোগান্তি

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই

বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়। এর আগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লেও চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নাকচ করে দেন এবং তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার বাবা ছিলেন মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) সম্পন্ন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে তিনি তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য আসামির মুক্তি নিশ্চিত হয়।

See also  ব্রাহ্মণপাড়ায় স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বিএনপি নেতাদের জুয়ার আসর, ভিডিও ভাইরাল

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত ঐতিহাসিক জনসভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভোলা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

মন্ত্রী হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেন এবং প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয়

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চান্দিনার আহবায়ক কমিটি গঠন

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই

১ জুন ২০২৬, ৭:০৯

বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) ও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়। এর আগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লেও চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নাকচ করে দেন এবং তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার বাবা ছিলেন মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) সম্পন্ন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে তিনি তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য আসামির মুক্তি নিশ্চিত হয়।

See also  ব্রাহ্মণপাড়ায় স্কুলের শ্রেণিকক্ষে বিএনপি নেতাদের জুয়ার আসর, ভিডিও ভাইরাল

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত ঐতিহাসিক জনসভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ। এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভোলা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

মন্ত্রী হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেন এবং প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।