
কৃষিকাজে ব্যবহৃত অন্যতম প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। শনিবার (১৮ এপ্রিল) থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের নতুন দাম ১০০ টাকার বদলে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের কৃষিখাতে। হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় এক ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে বাজারে চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে, যা দেশের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
বর্তমানে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টনই ব্যবহৃত হয় কৃষিখাতে। দেশের সেচ ব্যবস্থার ৮০ শতাংশ এবং জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে কৃষক ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
আগের দাম অনুযায়ী, কৃষকদের বছরে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। কিন্তু লিটারে ১৫ টাকা দাম বাড়ায় এখন সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত। এর মধ্যে রয়েছে ১০ লক্ষাধিক অগভীর নলকূপ, কয়েক হাজার গভীর নলকূপ ও লো-লিফট পাম্প এবং বিপুল সংখ্যক হারভেস্টার ও মাড়াই যন্ত্র।
বর্তমানে মাঠে বোরো ধানের শেষভাগের পরিচর্যা চলছে। দেশের মোট উৎপাদিত চালের ৬০ শতাংশই আসে বোরো থেকে, যা পুরোপুরি সেচনির্ভর। যদিও এই মুহূর্তে সেচের প্রয়োজন কিছুটা কম, তবুও ফসল কাটা, মাড়াই এবং পরিবহনে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহৃত হবে।

নওগাঁর সাপাহারের কৃষক আব্দুল মতিন জানান, ডিজেল সংকটের কারণে এমনিতেই সেচ খরচ বিঘাপ্রতি দুই হাজার থেকে বেড়ে আড়াই হাজার টাকা হয়েছিল। এখন দাম বাড়ায় খরচ আরও বাড়বে। গত বছর এক বিঘা জমিতে তার খরচ হয়েছিল ১৬ হাজার টাকা, যা এবার ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার কৃষক হালিম মিয়াও শোনালেন একই হতাশার কথা। তিনি জানান, শ্যালো মেশিনের সেচ খরচ ঘণ্টায় ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে। এছাড়া হারভেস্টার ও মাড়াই যন্ত্রের ভাড়াও নিশ্চিতভাবে বাড়বে। সব মিলিয়ে এবার বিঘাপ্রতি তার প্রায় তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি হবে। প্রথমত, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, “তেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের খরচ ব্যাপকভাবে বাড়ে। এর ফলে বোরো ধান ঘরে তোলা ও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে চালের দামের ওপর।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “আমাদের কৃষিখাত মূলত ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ঠিক রাখতে হলে শুধু ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না, কৃষকদের এই বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকের এই বাড়তি উৎপাদন ব্যয় যদি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে পুষিয়ে দেওয়া না হয়, তবে আগামীতে তারা ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। আর এমনটি হলে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
অনলাইন ডেস্ক 

















