বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রত্যাশিত প্রথম অধিবেশন আজ

বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। তবে অধিবেশন শুরুর আগেই সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম দিনের অধিবেশনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।

সরকারি দল বিএনপি এবং তাদের মিত্র সংসদ সদস্যরা এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। এ বিষয়টি ঘিরে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে। পাশাপাশি শপথ-সংক্রান্ত চিঠি এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে উচ্চ আদালতের জারি করা রুলও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রসঙ্গ এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদে ভাষণ দেওয়া নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে তারা অধিবেশনে অংশ নিলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ বর্জন করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে আজ তাদের চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হতে পারে বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর নতুন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। যদিও সরকারি দলের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তবুও বিরোধী দলও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা জানিয়েছেন, অতীতের মতো সংসদ বর্জনের রাজনীতি থেকে তারা বেরিয়ে এসে সংসদে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরবেন।

সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেছেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সরকার সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

See also  কুমিল্লায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, আটক ৪৫

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগে তারা সমর্থন দেবেন। তবে সরকার ভুল করলে সংসদের ভেতরে গঠনমূলক সমালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদও জানানো হবে।

সরকারি দল ইতোমধ্যে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও বিরোধী পক্ষ তাতে সাড়া দেয়নি। তাদের দাবি, ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণের আগে জুলাই সংস্কারের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে চান তারা। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে—এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি এবং সংসদেও তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। আজ সকাল ১১টায় সংসদের প্রথম বৈঠক শুরু হবে।

সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রথম বৈঠকে সাধারণত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। তবে এবার সেই পরিস্থিতি নেই। গত সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু একটি মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন। ফলে নতুন সংসদের কোনো সিনিয়র সদস্যের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সংসদ সচিবালয়ের সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে স্পিকারের আসন খালি রেখেই কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বর্তমান সংসদের একজন সিনিয়র সদস্যের নাম সভাপতির জন্য প্রস্তাব করবেন, যা অন্য একজন সদস্য সমর্থন করবেন। এরপর ওই সদস্যের সভাপতিত্বে বৈঠক পরিচালিত হবে। প্রথম বৈঠকের সভাপতির দায়িত্ব বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ওপর পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

See also  চান্দিনায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি ও চোর গ্রেপ্তার

সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদ সাময়িকভাবে মুলতবি করা হবে এবং এই সময় রাষ্ট্রপতি নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন। পরে নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন পুনরায় শুরু হবে।

অধিবেশনে নতুন স্পিকার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন দেবেন এবং এরপর সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এছাড়া সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন। এরপর সেই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে এবং সংসদ সদস্যরা অধিবেশনজুড়ে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন।

প্রথম অধিবেশন কতদিন চলবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কার্যউপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন তুলনামূলক দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে কারা আসবেন, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ড. এম ওসমান ফারুক এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নাম আলোচনায় রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের নামও আলোচনায় আছে।

জানা গেছে, আজকের প্রথম বৈঠকের পর দুই দিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৫ মার্চ দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রায় দুই সপ্তাহ বিরতি থাকবে। ২৯ মার্চ থেকে পুনরায় অধিবেশন শুরু হয়ে এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত চলতে পারে।

See also  আগস্টে ইউপি নির্বাচনের তফসিল, অক্টোবরে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি ইসির

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের দাবি, গণভোটে উত্থাপিত চারটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে সরকার জানিয়েছে, তারা সনদের যেসব বিষয়ে সম্মত হয়েছে সেগুলোই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনই দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ সংসদীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জনপ্রিয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রত্যাশিত প্রথম অধিবেশন আজ

১২ মার্চ ২০২৬, ১০:২৭

বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। তবে অধিবেশন শুরুর আগেই সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম দিনের অধিবেশনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।

সরকারি দল বিএনপি এবং তাদের মিত্র সংসদ সদস্যরা এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। এ বিষয়টি ঘিরে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে। পাশাপাশি শপথ-সংক্রান্ত চিঠি এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে উচ্চ আদালতের জারি করা রুলও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রসঙ্গ এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদে ভাষণ দেওয়া নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে তারা অধিবেশনে অংশ নিলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ বর্জন করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দলটির পক্ষ থেকে আজ তাদের চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হতে পারে বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর নতুন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। যদিও সরকারি দলের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তবুও বিরোধী দলও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা জানিয়েছেন, অতীতের মতো সংসদ বর্জনের রাজনীতি থেকে তারা বেরিয়ে এসে সংসদে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরবেন।

সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেছেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সরকার সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

See also  চৌদ্দগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল দুই মোটরসাইকেল আরোহীর

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগে তারা সমর্থন দেবেন। তবে সরকার ভুল করলে সংসদের ভেতরে গঠনমূলক সমালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদও জানানো হবে।

সরকারি দল ইতোমধ্যে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও বিরোধী পক্ষ তাতে সাড়া দেয়নি। তাদের দাবি, ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণের আগে জুলাই সংস্কারের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে চান তারা। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে—এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি এবং সংসদেও তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। আজ সকাল ১১টায় সংসদের প্রথম বৈঠক শুরু হবে।

সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রথম বৈঠকে সাধারণত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। তবে এবার সেই পরিস্থিতি নেই। গত সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু একটি মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন। ফলে নতুন সংসদের কোনো সিনিয়র সদস্যের সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সংসদ সচিবালয়ের সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে স্পিকারের আসন খালি রেখেই কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বর্তমান সংসদের একজন সিনিয়র সদস্যের নাম সভাপতির জন্য প্রস্তাব করবেন, যা অন্য একজন সদস্য সমর্থন করবেন। এরপর ওই সদস্যের সভাপতিত্বে বৈঠক পরিচালিত হবে। প্রথম বৈঠকের সভাপতির দায়িত্ব বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ওপর পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

See also  চান্দিনায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি ও চোর গ্রেপ্তার

সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদ সাময়িকভাবে মুলতবি করা হবে এবং এই সময় রাষ্ট্রপতি নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন। পরে নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন পুনরায় শুরু হবে।

অধিবেশনে নতুন স্পিকার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন দেবেন এবং এরপর সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এছাড়া সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন। এরপর সেই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে এবং সংসদ সদস্যরা অধিবেশনজুড়ে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন।

প্রথম অধিবেশন কতদিন চলবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কার্যউপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সাধারণত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন তুলনামূলক দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে কারা আসবেন, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ড. এম ওসমান ফারুক এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নাম আলোচনায় রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের নামও আলোচনায় আছে।

জানা গেছে, আজকের প্রথম বৈঠকের পর দুই দিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৫ মার্চ দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রায় দুই সপ্তাহ বিরতি থাকবে। ২৯ মার্চ থেকে পুনরায় অধিবেশন শুরু হয়ে এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত চলতে পারে।

See also  আগামী অর্থবছরে বিড়ির দাম বাড়বে না: অর্থমন্ত্রী

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের দাবি, গণভোটে উত্থাপিত চারটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে সরকার জানিয়েছে, তারা সনদের যেসব বিষয়ে সম্মত হয়েছে সেগুলোই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনই দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ সংসদীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।