
মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর বিরুদ্ধে লোকসানা প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে কারাবন্দি করার ঘটনা দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে একটি গুরুতর আঘাত হিসেবে দেখছে।
গতকাল (১২ মে ২০২৬) মঙ্গলবার মালদ্বীপের রাজধানী মালে অবস্থিত ফৌজদারি আদালত আদাধু নিউজ পোর্টালের দুই সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহজান ও লিভান আলি নাসিরকে যথাক্রমে ১৫ দিন এবং ১০ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। আদালত তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক নিষেধাজ্ঞা বা গ্যাগ অর্ডার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।
আদাধুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শাহজান প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সাথে গভীর রাতের ফোনালাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় শাস্তির মুখে পড়েন। অন্যদিকে, নাসির আদালত কর্তৃক প্রদত্ত গ্যাগ অর্ডার সম্পর্কে খবর প্রকাশ করায় অভিযুক্ত হন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, মামলা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জনগণের কাছে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল।
এই সংকটের সূচনা হয় ২৮ মার্চ প্রকাশিত ‘আইশা’ শিরোনামের একটি ডকুমেন্টারি থেকে। প্রামাণ্যচিত্রে একজন নারী, যার পরিচয় গোপন রাখা হয়, দাবি করেন যে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তবে মুইজ্জু এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে বলেন, অভিযোগগুলো “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা”।
ডকুমেন্টারি প্রকাশের পরপরই মালদ্বীপের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদাধু সংবাদ সংস্থার অফিসে তল্লাশি চালায়। এই অভিযানে সাংবাদিক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ, হার্ডড্রাইভ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হয়।
আদাধু সংবাদ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা দাবি করছেন যে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে গোপনে পরিচালিত হয়েছে। অভিযুক্ত সাংবাদিকদের নিজেদের পক্ষ সমর্থনের জন্য যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আইনজীবী নিয়োগের জন্যও অত্যন্ত সীমিত সময় পাওয়া গেছে। এই সবকিছু মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘অন্যায্য’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটি (CPJ) এটিকে “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানি” হিসেবে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনও দুই সাংবাদিকের কারাদণ্ড নিন্দা করে তাদের তাৎক্ষণিক মুক্তির দাবি জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ হুসাইন শরীফ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ অস্বীকার করে বলেন, এই বিচারপ্রক্রিয়ার সাথে গণমাধ্যম স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। তার দাবি, সরকার স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমকে সমর্থন করে এবং সমালোচনাকেও স্বাগত জানায়। তবে এই বক্তব্য অনেক পর্যবেক্ষক এবং আইনবিদকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
মালদ্বীপের সাংবাদিক সংগঠন ‘মালদ্বীপ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’ এই ধরনের রায়কে দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব বলে মন্তব্য করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে আদালতের গ্যাগ অর্ডার মালদ্বীপের সংবিধানের মৌলিক নীতি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ এই ঘটনাকে “সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর একটি স্পষ্ট প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছেন। সাবেক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি হুসনু আল-সুউদও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়”।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা মালদ্বীপে গণতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংকটের একটি প্রতীক। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট পুনর্গঠন এবং নতুন গণমাধ্যম আইন পাসের পর থেকেই দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা তীব্র হতে থাকে।
উল্লেখ্য যে, ‘আইশা’ প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের মাত্র কয়েক দিন পর একটি সাংবিধানিক গণভোটে প্রেসিডেন্টের সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বিশাল ভোটাধিক্যে প্রত্যাখ্যাত হয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই দুটি ঘটনাই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়েছে।
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুই সাংবাদিকের মুক্তি এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি সরকারের নমনীয় মনোভাব প্রদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছে।
ছালাউদ্দিন রিপন 

















