
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া চার রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও, সেই আদেশ অমান্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অন্য তিন রাষ্ট্রদূত দেশে ফিরে এলেও, প্রত্যাহারের দেড় মাস পার হওয়ার পরও কর্মস্থল ত্যাগ করেননি তিনি। উল্টো সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি নিয়মিত অফিস করছেন এবং পদে বহাল থাকতে নানা রাজনৈতিক তদবির চালাচ্ছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৮ মার্চ এক আদেশে পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত চার রাষ্ট্রদূতকে সদর দপ্তর ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে পর্তুগালের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মাহফুজুল হক, মেক্সিকোর এম মুশফিকুল ফজল (আনসারী) এবং পোল্যান্ডের মো. ময়নুল ইসলাম ঢাকায় ফিরে রিপোর্ট করেছেন। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার আবিদা ইসলামও প্রত্যাহার আদেশের পর দেশে ফিরেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে মাহফুজুল হক ও ময়নুল ইসলামের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।

তবে ব্যতিক্রম কেবল মালদ্বীপের হাইকমিশনার নাজমুল ইসলাম। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রত্যাহারের নির্দেশ পাওয়ার পর দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তর করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করাটাই কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও নিয়ম। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো আরও অন্তত ছয় মাস সেখানে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সরকারের একাধিক কর্মকর্তার মতে, বিধি অনুযায়ী প্রত্যাহারের আদেশের পরদিন থেকেই তার দাপ্তরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কথা নয়। অথচ তিনি নিয়মিত অফিস করায় রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য তার হস্তগত হওয়ার সুযোগ থাকছে, যা দেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মালদ্বীপে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন ৩৪ বছর বয়সী নাজমুল ইসলাম। তার এই নিয়োগ শুরু থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি, তরুণ বয়স, টানা এক দশক তুরস্কে বসবাস এবং বিদেশি (তুর্কি) স্ত্রীর কারণে তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জানা যায়, তুরস্কের আঙ্কারা ইলদিরিম বায়েজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা নাজমুলের নিয়োগের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং ইউনূস সেন্টারের সঙ্গে তার পূর্ব-পরিচয়। মাহফুজ আলম প্রাথমিকভাবে তাকে তুরস্কেই রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও পররাষ্ট্র সচিবের আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হস্তক্ষেপে তাকে মালদ্বীপে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বিতর্কের মুখে তিনি তড়িঘড়ি করে ইউনূস সেন্টারে কাজ করার সময়কার সব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলেন।
এছাড়া, গত বছর আনতালিয়া কূটনৈতিক ফোরামে অংশ নিতে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সরকারি সফরে তুরস্কে গেলে প্রটোকল ভেঙে বন্ধু নাজমুল ইসলামের বাসায় অবস্থান করেন। আনতালিয়া ফোরামেও নাজমুলকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে দেখা যায়।
সাবেক কূটনীতিকরা মনে করছেন, সরকারের আদেশ অমান্য করে এভাবে পদে বহাল থাকা চরম অসদাচরণের শামিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কূটনীতিক জানান, আগের সরকার তাকে নিয়োগ দিলেও বর্তমান সরকার তাকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দিয়েছে। এই আদেশ অমান্য করা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সরাসরি অসম্মান প্রদর্শন। তিনি যদি তদবিরের মাধ্যমে আরও কিছুদিন থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন, তবে তা জনপ্রশাসন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ভুল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















