
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং সমাজ, শিক্ষা, রাজনীতি ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন কীভাবে একটি মসজিদ ন্যায়, শিক্ষা, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র হতে পারে।
• নববী যুগে মসজিদভিত্তিক রাজনীতি- মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর নবী করিম (সা.)-এর সকল রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হতো মসজিদ থেকে। নামাজ, শিক্ষা, বিচার, যুদ্ধনীতি, দাওয়াত, এমনকি বিদেশি দূতদের গ্রহণ—সবকিছুই পরিচালিত হতো মসজিদে নববী থেকে। সহীহ বুখারি (হাদীস: ৪৩৩) ও সহীহ মুসলিম (হাদীস: ৫২৪)-এ বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করিম (সা.) মসজিদে নববী নির্মাণের পর এখান থেকেই মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন: “রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সাহাবাদের মসজিদে একত্র করে পরামর্শ করতেন।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯; তাফসিরে ইবনে কাসির)
নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাব চাওয়া হবে।” (সহীহ বুখারি, হাদীস: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৮২৯)
এই হাদীস ইসলামী রাজনীতির মৌলিক নীতি—জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ—স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
• নববী রাজনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
১. মসজিদ ছিল প্রশাসনিক ও পরামর্শ কেন্দ্র।
২. শুরা (পরামর্শ) ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূলনীতি।
“তুমি তাদের ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ কর।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯)
৩. রাজনীতি ছিল দায়িত্ব ও আমানতের ক্ষেত্র।
“নেতৃত্ব একটি আমানত…” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৮২৫)
৪. ধর্মীয় সহাবস্থান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। মদিনা সনদে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের অধিকার সংরক্ষিত ছিল।
• জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নববী আদর্শের অনুসারী একটি ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন, যার মূল ভিত্তি মসজিদ ও সমাজকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। দলটির রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন হলো—রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, বরং সেবা ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের একটি মাধ্যম।
জামায়াতে ইসলামী মনে করে, ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে মসজিদকে কেন্দ্র করেই শিক্ষা, দাওয়াত, সমাজকল্যাণ ও নেতৃত্ব বিকাশের কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যেই তারা স্থানীয় মসজিদে নিয়মিত দাওয়াতি সভা, কোরআন শিক্ষা, সমাজসেবা ও শুরাভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তা যথাযথভাবে পালন করে, সে হবে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়ার নিচে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৮২৭)
এই হাদীস জামাতে ইসলামী নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মসজিদভিত্তিক রাজনীতি ইসলামের মৌলিক ঐতিহ্য, যা নবী করিম (সা.)-এর যুগে বাস্তবায়িত হয়েছিল ন্যায়, সেবা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সেই ঐতিহ্যের আধুনিক ধারক—যারা রাজনীতিকে দেখেছে ইবাদত ও দায়িত্ব হিসেবে, ক্ষমতা নয়।
আজকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈতিক শূন্যতার সময়ে নববী মডেলের মসজিদভিত্তিক রাজনীতি হতে পারে একটি আলোকবর্তিকা—যেখানে শাসনের মূলে থাকবে আল্লাহভীতি, শুরা ও মানবকল্যাণ।
– লেখক- আব্দুর রহিম
সাবেক শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
Reporter Name 















