
রাষ্ট্র হলো মানবসমাজ পরিচালনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইতিহাসে বিভিন্ন শাসক ও দার্শনিক রাষ্ট্র গঠনের নানা মডেল প্রস্তাব করেছেন। তবে এসব মডেলের অধিকাংশই বৈষম্য, শোষণ, স্বৈরতন্ত্র ও বর্ণবাদে পরিপূর্ণ ছিল। প্রায় ১৫০০ বছর আগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ মদীনা নগরীতে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের মডেল। এই রাষ্ট্রে সমতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বন্টন নিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে বলা যায়, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-ই আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপকার।
☞ কুরআনের আলোকে রাষ্ট্রীয় নীতি:
কুরআন শরীফ শুধু ইবাদতের বিধান নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার মূলনীতিও দিয়েছে।
১. ন্যায়বিচার : “যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়বিচার করবে।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
২. সমতা : “নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।” (সূরা হুজুরাত: ১০)
৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা : “ধর্মের বিষয়ে কোন জবরদস্তি নেই।” (সূরা বাকারা: ২৫৬)
৪. শাসনের যোগ্যতা : “আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খলিফা করবেন যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে।” (সূরা নূর: ৫৫) এসব আয়াত রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়, সমতা, নিরাপত্তা ও কল্যাণকে ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
☞ সুন্নাহর আলোকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা: রাসূল ﷺ হাদীসের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি ঘোষণা করেছেন। “তোমাদের প্রত্যেকেই নেতা এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে জবাবদিহি করবে।” (বুখারী, মুসলিম) “মানুষ আল্লাহর পরিবার; আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকামী।” (বায়হাকী)
বিদায়ী হজ্বের ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন—“কোনো আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; কেবল তাকওয়া ছাড়া। এভাবে সুন্নাহ রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক, মানবকল্যাণকেন্দ্রিক ও বৈষম্যমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
☞ মদীনা রাষ্ট্র: প্রথম কল্যাণ রাষ্ট্র হিজরতের পর মহানবী ﷺ মদীনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, তা ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ রাষ্ট্র।
১. মদীনা সনদ: মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে লিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয়। এত — প্রতিটি সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। সামাজিক ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সামাজিক কল্যাণ: যাকাত, সদকা, ফিতরা প্রবর্তন করে গরিব, এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করে। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ঘোষণা করে সম্পদ ভাগাভাগি করা হয়।
৩. অর্থনৈতিক নীতি: সুদ নিষিদ্ধ করে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করা হয়। ধনসম্পদের কুক্ষিগত হওয়া বন্ধ করে ন্যায্য বন্টন নিশ্চিত করা হয়।
৪. আইনের শাসন: শাসক ও প্রজা সবার জন্য একই আইন কার্যকর ছিল। বিচারকার্যে কোনো প্রকার স্বজনপ্রীতি বা বৈষম্য ছিল না।
৫. শিক্ষা ও জ্ঞান: মসজিদে নববীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বন্দীদের মুক্তির শর্ত ছিল—তারা যদি মুসলমান শিশুদের সাক্ষরজ্ঞান শেখায়। জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ ঘোষণা করা হয়।
☞ আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা: আজকের আধুনিক রাষ্ট্র যে বিষয়গুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেগুলো মদীনা রাষ্ট্রেই বাস্তবায়িত হয়েছিল।
◑ মানবাধিকার : জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার গ্যারান্টি।
◑ আইনের শাসন : শাসক-প্রজা সবার জন্য সমান আইন।
◑ সামাজিক কল্যাণ : দরিদ্র, এতিম ও দুর্বল শ্রেণির দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে।
◑ অর্থনৈতিক ন্যায় : সুদমুক্ত অর্থনীতি ও ন্যায়সঙ্গত বন্টন।
◑ গণতন্ত্র/শুরা : রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত পরামর্শের মাধ্যমে গৃহীত হতো।
◑ জাতিগত সমতা : বর্ণবাদ ও গোত্রকেন্দ্রিক শ্রেষ্ঠত্ব বিলোপ করা হয়েছিল।
উপসংহার: মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্র শুধু একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল না; বরং তা ছিল মানবতার কল্যাণে গঠিত সর্বপ্রথম আধুনিক রাষ্ট্র। এতে সংবিধান, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক কল্যাণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা হয়েছিল। তাই আজকের রাষ্ট্রতত্ত্বে যেসব বিষয়কে আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য বলা হয়, তার সবই বিদ্যমান ছিল নবী ﷺ প্রতিষ্ঠিত মদীনা রাষ্ট্রে।
তাই ইতিহাস ও যুক্তির আলোকে নির্দ্বিধায় বলা যায়—বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-ই আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপকার।
লেখক – মু. তাজুল ইসলাম
প্রিন্সিপাল
জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চান্দিনা
Reporter Name 















