সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
চান্দিনায় চুরির জেরে রাজনৈতিক দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চিলোড়া বাজার ঢাকাস্থ চান্দিনা ছাত্র কল্যাণ সমিতির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা উইন্ডোজের বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম আনছে গুগল, পিসিতেই মিলবে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস: নিহত প্রায় ৬০০, নিখোঁজ শতাধিক দেবিদ্বারে গাঁজাসহ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আটক কুমিল্লা ফুডপান্ডায় নিয়োগ, অভিজ্ঞতা ছাড়াও আবেদনের সুযোগ বুড়িচংয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বসতঘরসহ দুটি ঘর পুড়ে ছাই শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা অবস্থা ‘অপরিবর্তিত’ এখনও ‘শঙ্কামুক্ত নন’ বেগম খালেদা জিয়া মঞ্চে লাল গালিচার ব্যবহার কীভাবে এলো? জানুন এর ইতিহাস

জুলাই শহীদ দিবস ও আবু সাঈদের আত্মত্যাগ; স্বৈরাচার হাসিনার অভ্যুত্থানের জন্ম

ছালাউদ্দিন রিপনঃ

১৬ জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বেদনার্ত, আবার একইসাথে গৌরবোজ্জ্বল দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি আজও গণমানুষের হৃদয়ে সাহস, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে। পুলিশের শটগানের গুলি তার শরীর বিদ্ধ করে ফেলে দেয় রাজপথে। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়ের—জুলাই অভ্যুত্থানের।

আবু সাঈদ ছিলেন শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী, ছাত্রসমাজের প্রতীক। তার আত্মত্যাগে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর, ধীরে ধীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ সারাদেশে। ছাত্র, যুবক, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন এই গণআন্দোলনে। সেই দিন থেকেই আবু সাঈদ হয়ে যান একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি—যেখানে আছে প্রতিবাদ, আছে প্রতিরোধ এবং সর্বোপরি আছে সম্মিলিত মুক্তির প্রত্যাশা।

আবু সাঈদের শহীদ হওয়া ছিল নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত নিপীড়নের অংশ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। ভিডিওচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান প্রমাণ করে, সাঈদ জানতেন তিনি কী ঝুঁকি নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাধারণ একটি লাঠি হাতে।

তার এই আত্মত্যাগ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে ঢাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বলাকা সিনেমা হলের সামনে নিহত হন হকার মো. শাহজাহান ও নীলফামারীর বাসিন্দা সাবুজ আলী। এভাবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে একের পর এক প্রাণ হারান তরুণরা, যাদের রক্তে লেখা হয় প্রতিবাদের ইতিহাস।

আজ ১৬ জুলাই—শহীদ আবু সাঈদের প্রথম শাহাদতবার্ষিকী। এই দিনটিকে “জুলাই শহীদ দিবস” হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে। দেশের সব সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠিত হচ্ছে দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা। পীরগঞ্জে শহীদের নিজ গ্রামে এবং রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জনসভা, যাতে অংশ নিচ্ছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

আবু সাঈদদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়নের দাবি বহুদিনের। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন—কেন আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ ও ওয়াসিমসহ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদদের ‘জাতীয় শহীদ’ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে। পাশাপাশি শহীদদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আবু সাঈদের মতো সাহসী ও আদর্শবাদী তরুণদের আত্মত্যাগ থেকেই জন্ম নেয় নতুন আন্দোলনের ভাষা, দিশা এবং সুর। তার দু’হাতের মতোই ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের আগুন। জাতি যখন অবিচার, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের চক্রে বন্দী, তখন আবু সাঈদের মতো একজন তরুণ ইতিহাসকে বাঁক ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তার আত্মবলিদান আজ আমাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের যে স্বপ্ন আবু সাঈদরা দেখেছিলেন, তা কি সত্যিই বাস্তবায়নের পথে?

শহীদ আবু সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে হয়—তিনি শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি যুগের প্রতিনিধি। তার রক্তে লেখা ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রতিবাদ নস্যাৎ করা। জুলাই শহীদ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আবু সাঈদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের।

চান্দিনায় চুরির জেরে রাজনৈতিক দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চিলোড়া বাজার

জুলাই শহীদ দিবস ও আবু সাঈদের আত্মত্যাগ; স্বৈরাচার হাসিনার অভ্যুত্থানের জন্ম

১৬ জুলাই ২০২৫, ৮:৫৭

ছালাউদ্দিন রিপনঃ

১৬ জুলাই—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বেদনার্ত, আবার একইসাথে গৌরবোজ্জ্বল দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি আজও গণমানুষের হৃদয়ে সাহস, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে। পুলিশের শটগানের গুলি তার শরীর বিদ্ধ করে ফেলে দেয় রাজপথে। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়ের—জুলাই অভ্যুত্থানের।

আবু সাঈদ ছিলেন শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী, ছাত্রসমাজের প্রতীক। তার আত্মত্যাগে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর, ধীরে ধীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ সারাদেশে। ছাত্র, যুবক, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন এই গণআন্দোলনে। সেই দিন থেকেই আবু সাঈদ হয়ে যান একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি—যেখানে আছে প্রতিবাদ, আছে প্রতিরোধ এবং সর্বোপরি আছে সম্মিলিত মুক্তির প্রত্যাশা।

আবু সাঈদের শহীদ হওয়া ছিল নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত নিপীড়নের অংশ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন বলছে, মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। ভিডিওচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান প্রমাণ করে, সাঈদ জানতেন তিনি কী ঝুঁকি নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সাধারণ একটি লাঠি হাতে।

তার এই আত্মত্যাগ কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে ঢাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বলাকা সিনেমা হলের সামনে নিহত হন হকার মো. শাহজাহান ও নীলফামারীর বাসিন্দা সাবুজ আলী। এভাবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে একের পর এক প্রাণ হারান তরুণরা, যাদের রক্তে লেখা হয় প্রতিবাদের ইতিহাস।

আজ ১৬ জুলাই—শহীদ আবু সাঈদের প্রথম শাহাদতবার্ষিকী। এই দিনটিকে “জুলাই শহীদ দিবস” হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে। দেশের সব সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠিত হচ্ছে দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা। পীরগঞ্জে শহীদের নিজ গ্রামে এবং রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জনসভা, যাতে অংশ নিচ্ছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

আবু সাঈদদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়নের দাবি বহুদিনের। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন—কেন আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ ও ওয়াসিমসহ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদদের ‘জাতীয় শহীদ’ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে। পাশাপাশি শহীদদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আবু সাঈদের মতো সাহসী ও আদর্শবাদী তরুণদের আত্মত্যাগ থেকেই জন্ম নেয় নতুন আন্দোলনের ভাষা, দিশা এবং সুর। তার দু’হাতের মতোই ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের আগুন। জাতি যখন অবিচার, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের চক্রে বন্দী, তখন আবু সাঈদের মতো একজন তরুণ ইতিহাসকে বাঁক ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তার আত্মবলিদান আজ আমাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের যে স্বপ্ন আবু সাঈদরা দেখেছিলেন, তা কি সত্যিই বাস্তবায়নের পথে?

শহীদ আবু সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে হয়—তিনি শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি যুগের প্রতিনিধি। তার রক্তে লেখা ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রতিবাদ নস্যাৎ করা। জুলাই শহীদ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আবু সাঈদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের।