
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। একই মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু করে এবং প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ৪৫৩ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ পাঠ শেষে বিকেল পৌনে তিনটার দিকে রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালত জানায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং আরেকটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামুন নিজের অপরাধ স্বীকার করে সত্য উন্মোচন করায় তার সাজা লঘু করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগে এ মামলা দায়ের হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র ক্যাডারদের সরাসরি নির্দেশ দেন আন্দোলনকারীদের দমন করতে। এতে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার আহত হন।
প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর মধ্যে তথ্যসূত্র ছিল দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকা দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠা। মামলায় মোট ৫৪ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
অভিযোগসমূহ- মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়, উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যায় প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র, রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ, আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবিও দায়িত্ব পালন করে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদা পোশাকে মাঠে ছিলেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লকডাউন ও শাটডাউনের নামে নাশকতা প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আদালতে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণহত্যার দায়ে সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এ রায়কে যুগান্তকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় প্রদর্শিত হয়। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আদালতে উপস্থিত থেকে রায় প্রত্যক্ষ করেন।
অনলাইন ডেস্ক 









