সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
চান্দিনায় চুরির জেরে রাজনৈতিক দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চিলোড়া বাজার ঢাকাস্থ চান্দিনা ছাত্র কল্যাণ সমিতির ২০২৫–২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা উইন্ডোজের বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম আনছে গুগল, পিসিতেই মিলবে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস: নিহত প্রায় ৬০০, নিখোঁজ শতাধিক দেবিদ্বারে গাঁজাসহ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আটক কুমিল্লা ফুডপান্ডায় নিয়োগ, অভিজ্ঞতা ছাড়াও আবেদনের সুযোগ বুড়িচংয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বসতঘরসহ দুটি ঘর পুড়ে ছাই শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা অবস্থা ‘অপরিবর্তিত’ এখনও ‘শঙ্কামুক্ত নন’ বেগম খালেদা জিয়া মঞ্চে লাল গালিচার ব্যবহার কীভাবে এলো? জানুন এর ইতিহাস

ইসলামে ঈদ ও মোগলদের ঈদ উৎসব -মো: তাজুল ইসলাম

 

ইসলামে ঈদ ও মোগলদের ঈদ উৎসব

মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা, ভালোবাসা, আনন্দ উচ্ছ্বাসের জন্য আল্লাহ তা’আলা বছরে দুটি ঈদের প্রচলন করেন। মহানবী (সা.) ঈদের দিন ছোট-বড় সবার আনন্দের প্রতি খেয়াল করতেন। মদিনার ছোট ছোট শিশু-কিশোরের সঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) আনন্দ করতেন। শরিয়তের স্বীকৃত সব আনন্দ করার অনুমতি দিতেন।
ইব্রাহিম (আ.) এর ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে বা এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন আল্লাহ তা’আলা রোজাদারদের তাদের ইবাদতের সওয়াব ও পুরস্কার দান করবেন। জাহান্নামীদের তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেবেন। তাই রোজাদাররা খুশি হয়ে শুকরিয়া স্বরূপ দান-সদকা করে এবং ঈদের নামাজ আদায় করে। এই নামাজকে নবী (সা.) এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে ইসলামের শুরু যুগে নারী ও শিশুদেরও ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া হতো; এমনকি ঋতুমতী নারীও ঈদগাহে উপস্থিত হতো।

ঈদ পরিচিতি:
শাব্দিক অর্থ: ঈদ শব্দটি আরবি عيد। অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি। শব্দের মূল রূপ হলো আওদ, যার অর্থ ফিরে আসা। (আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫)
পারিভাষিক অর্থ: আল মুনজিদ অভিধানে বলা হয়েছে, ঈদ এমন দিনকে বলা হয়, যাতে লোকজনের সমাগম হয় বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তি অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার স্মৃতিচারণা করা হয়। (আল মুনজিদ পৃ. ১০৩৮) ইসলামের পরিভাষায়, মুসলমানরা বছরে যে দুটি দিবসকে আনন্দ ও উৎসবের দিবস হিসেবে পালন করে থাকে, তাকে ঈদ বলা হয়। (আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫) আরবদের কাছে ঈদ বলা হয় এমন সময়কে, যে সময় আনন্দ ও দুঃখ ফিরে আসে। (লিসানুল আরব, ইবনে মুনজির : ৬/৫১০)

ঈদের নামকরণ:
ঈদ শাব্দিক অর্থ হলো ‘বারবার ফিরে আসা (عَادَ-يَعُوْدُ-عِيْدًا) এ দিনটি বারবার ফিরে আসে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঈদ। আল্লাহ তা‘আলা এদিনে তার বান্দাকে নি‘আমাত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করে থাকেন, বারবার ইহসান করেন। রমযানের পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। ফিত্‌রা প্রদান ও গ্রহণ, হজ পালন ও কুরবানীর মাংস ভক্ষণ ইত্যাদি নি‘আমাত বছর ঘুরিয়ে তিনি বারবার বান্দাদেরকে ফিরিয়ে দেন। এতে মানুষের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হয়। এসব কারণে এ দিবসের নামকরণ হয়েছে ঈদ। (মেরকাত শরহে মেশকাত : ৩/৪৭৭)

ঈদের প্রবর্তন:
মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ঈদের প্রবর্তন হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান যে মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব ও বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করছে। তারা এ উৎসবে নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আনন্দ উৎসব করে থাকে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন এ দু’টি দিনের তাৎপর্য কী? মাদিনাবাসীরা উত্তর দিল আমরা জাহেলী যুগ থেকে এ দু’দিনে খেলাধুলা করে আসছি। তখন রাসূলে করীম (সা.) বললেন,
قَدْ أَبْدَلَكُمُ اللهُ خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمُ الأَضَحٰى وَيَوْمُ الْفِطْرِ
আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন এ দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দু’টি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। আর সেই দিন দু’টি হল : ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। (আবূ দাউদ : ১১৩৪; নাসাঈ : ১৫৫৬)
১. ঈদুল ফিতর: ঈদুল ফিতর আরবি শব্দ عيد الفطر, অর্থ: “রোজা/উপবাস ভাঙার আনন্দ” দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা ও সামর্থ্যবানদের ফিতরা ও যাকাত আদায়ের পর সাওয়ালের ১ম দিন পালিত ঈদ কে ঈদুল ফিতর বলে।
২. ঈদুল আযহা: ঈদুল আজহা বা ঈদুল আদহা আরবি: عيد الأضحى, অর্থ ‘ত্যাগের উৎসব। এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। আরবি জ্বিলহজ্জ মাসের ১০-১৩ পর্যন্ত আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ ও উট আল্লাহর নামে কোরবানি করাকে ঈদুল আজহা বলে।

মদিনায় প্রথম ঈদ:
এ সম্পর্কে দুটি অভিমত পাওয়া যায়— প্রথমত, আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে প্রথম হিজরিতে ঈদের নামাজের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বেশির ভাগ আলেমের মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে তার বিধান প্রবর্তিত হয়। মুসলমানরা মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়ে দ্বিতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ বা ৩১ মার্চ।
এই অভিমতই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রোজা ফরজ হয়। এ হিসাবে দ্বিতীয় হিজরিতেই ঈদের নামাজের বিধান প্রবর্তিত হয়। (মেরকাত শরহে মেশকাত : ৩/৪৭৭; আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫; আল বিদায়া ওয়ান নেহায়া : ৫/৫৪)

ঈদের সালাত ও পদ্ধতি:
ঈদের নামাজ সূর্যাস্তের পর থেকে জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পড়া যায়। এ নামাজ জামাতের সঙ্গে ঈদগাহে আদায় করা ওয়াজিব।
ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেছেন, ঈদের সালাত প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ একই মত পোষণ করেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে যেতেন।’ (বুখারি)। তবে বিশেষ কারণে ঈদগাহে আদায় করতে না পারলে মসজিদে আদায় করা যায়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একবার বৃষ্টি হওয়ায় মহানবী (সা.) সবাইকে নিয়ে মসজিদে ঈদের সালাত পড়েন।’ (আবু দাউদ) ঈদের সালাত দুই রাকা‘আত। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
صَلاَةُ الْجُمُعَةِ رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ الْفِطْرِ رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ الأَضْحَى رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ السَّفَرِ رَكْعَتَانِ
জুমু‘আর সালাত দু’ রাক‘আত, ঈদুল ফিতরের সালাত দু’ রাক‘আত, ঈদুল আজহার সালাত দু’ রাক‘আত এবং সফর অবস্থায় (চার রাক‘আত বিশিষ্ট ফরয) সালাত দুই রাক‘আত। (নাসাঈ : ১৪২০)
ঈদের সালাতে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর ‘‘আল্লাহু আকবার বলে অতিরিক্ত তাকবীর দিতে হয়। এ বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে :
ক. হানাফী মাযহব মতে ১ম রাকায়াতে ছানার পর ৩টি ও আর ২য় রাক‘আতে রুকুর পর অতিরিক্ত ৩টি মোট ৬ তাকবীর দিতে হয়।
খ. দ্বিতীয় মত হল ১ম ও ২য় রাক‘আতে যথাক্রমে অতিরিক্ত ৭ + ৫ = মোট ১২ তাকবীর। এটি বাকী ৩ মাযহাবের মত।

ঈদের সালাতের আগে করণীয়:
১. গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব।
২. ঈদুল ফিতরের দিন খাবার খেয়ে ঈদের সালাতে যাওয়া, আর ঈদুল আযহার দিন না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। তাছাড়া ঈদুল আযহার সালাত শেষে কুরবানীর মাংস দিয়ে খাবার গ্রহণ করা সুন্নাত।
৩. ঈদগাহে পায়ে হেটে যাওয়া মুস্তাহাব। আর একপথে যাবে এবং ভিন্ন পথ দিয়ে আবার পায়ে হেটেই আসা সুন্নাত।
৪. তাকবীর পড়া এবং তা বেশি বেশি ও উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত তাকবীর দিতে দিতে যেতেন।

ঈদের তাকবীর: ঈদের দিন রাসূল (সা.) যে তাকবীর পড়তে পড়তে যেতেন সেটি হল :
اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ
اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ
অর্থ : আল্লাহ মহান, আল্লাহ অতিমহান, তিনি ছাড়া সত্যিকার আর কোন মা‘বুদ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান আর সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁরই জন্য।

ঈদের খুৎবা: ঈদের খুৎবা শ্রবণ করা মুস্তাহাব। তবে যারা ঈদের খুৎবা না শুনে চলে যাবে তাদের গোনাহ না হলেও তারা ঈদের গুরুত্বপূর্ণ দু‘আ ও ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে।

মোগল সাম্রাজ্যের ঈদ উদযাপন:
মোগল সম্রাটদের ঈদ উদযাপন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও রাজকীয়। ঈদের আগের রাতে চাঁদ দেখা গেলে রাজধানীতে ঢাকঢোল ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা করা হতো। ঈদের সকালে সম্রাট ও রাজপরিবারের সদস্যরা সুসজ্জিত পোশাক পরে ঈদের নামাজে অংশ নিতেন, যা সাধারণত বিশাল ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হতো। এরপর বিশেষ দরবার বসানো হতো, যেখানে অভিজাতরা সম্রাটকে উপহার দিতেন এবং সম্রাটও প্রজাদের মধ্যে দান-খয়রাত করতেন। রাজকীয় ভোজে বিরিয়ানি, শির খুরমা, নেহারি ও নানা সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হতো। এছাড়া হাতি-ঘোড়ার শোভাযাত্রা, আতশবাজি, নৃত্য-সঙ্গীতসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত। বিশেষত আকবর ও শাহজাহানের সময় ঈদ উদযাপন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য, তবে ঔরঙ্গজেব তুলনামূলক সাধারণভাবে ঈদ পালন করতেন। মোগলদের ঈদ ছিল ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ভরপুর এক রাজকীয় উৎসব।

মহান আল্লাহ সবাইকে ইসলামের নির্দেশনা মোতাবেক ঈদ উৎসব উদযাপন করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক:-

মো: তাজুল ইসলাম

অধ্যক্ষ, চান্দিনা জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

Tag :

চান্দিনায় চুরির জেরে রাজনৈতিক দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চিলোড়া বাজার

ইসলামে ঈদ ও মোগলদের ঈদ উৎসব -মো: তাজুল ইসলাম

৩০ মার্চ ২০২৫, ৩:৪২

 

ইসলামে ঈদ ও মোগলদের ঈদ উৎসব

মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা, ভালোবাসা, আনন্দ উচ্ছ্বাসের জন্য আল্লাহ তা’আলা বছরে দুটি ঈদের প্রচলন করেন। মহানবী (সা.) ঈদের দিন ছোট-বড় সবার আনন্দের প্রতি খেয়াল করতেন। মদিনার ছোট ছোট শিশু-কিশোরের সঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) আনন্দ করতেন। শরিয়তের স্বীকৃত সব আনন্দ করার অনুমতি দিতেন।
ইব্রাহিম (আ.) এর ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে বা এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন আল্লাহ তা’আলা রোজাদারদের তাদের ইবাদতের সওয়াব ও পুরস্কার দান করবেন। জাহান্নামীদের তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেবেন। তাই রোজাদাররা খুশি হয়ে শুকরিয়া স্বরূপ দান-সদকা করে এবং ঈদের নামাজ আদায় করে। এই নামাজকে নবী (সা.) এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে ইসলামের শুরু যুগে নারী ও শিশুদেরও ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া হতো; এমনকি ঋতুমতী নারীও ঈদগাহে উপস্থিত হতো।

ঈদ পরিচিতি:
শাব্দিক অর্থ: ঈদ শব্দটি আরবি عيد। অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি। শব্দের মূল রূপ হলো আওদ, যার অর্থ ফিরে আসা। (আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫)
পারিভাষিক অর্থ: আল মুনজিদ অভিধানে বলা হয়েছে, ঈদ এমন দিনকে বলা হয়, যাতে লোকজনের সমাগম হয় বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তি অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার স্মৃতিচারণা করা হয়। (আল মুনজিদ পৃ. ১০৩৮) ইসলামের পরিভাষায়, মুসলমানরা বছরে যে দুটি দিবসকে আনন্দ ও উৎসবের দিবস হিসেবে পালন করে থাকে, তাকে ঈদ বলা হয়। (আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫) আরবদের কাছে ঈদ বলা হয় এমন সময়কে, যে সময় আনন্দ ও দুঃখ ফিরে আসে। (লিসানুল আরব, ইবনে মুনজির : ৬/৫১০)

ঈদের নামকরণ:
ঈদ শাব্দিক অর্থ হলো ‘বারবার ফিরে আসা (عَادَ-يَعُوْدُ-عِيْدًا) এ দিনটি বারবার ফিরে আসে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঈদ। আল্লাহ তা‘আলা এদিনে তার বান্দাকে নি‘আমাত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করে থাকেন, বারবার ইহসান করেন। রমযানের পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। ফিত্‌রা প্রদান ও গ্রহণ, হজ পালন ও কুরবানীর মাংস ভক্ষণ ইত্যাদি নি‘আমাত বছর ঘুরিয়ে তিনি বারবার বান্দাদেরকে ফিরিয়ে দেন। এতে মানুষের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হয়। এসব কারণে এ দিবসের নামকরণ হয়েছে ঈদ। (মেরকাত শরহে মেশকাত : ৩/৪৭৭)

ঈদের প্রবর্তন:
মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ঈদের প্রবর্তন হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান যে মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব ও বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করছে। তারা এ উৎসবে নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আনন্দ উৎসব করে থাকে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন এ দু’টি দিনের তাৎপর্য কী? মাদিনাবাসীরা উত্তর দিল আমরা জাহেলী যুগ থেকে এ দু’দিনে খেলাধুলা করে আসছি। তখন রাসূলে করীম (সা.) বললেন,
قَدْ أَبْدَلَكُمُ اللهُ خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمُ الأَضَحٰى وَيَوْمُ الْفِطْرِ
আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন এ দু’দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দু’টি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। আর সেই দিন দু’টি হল : ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। (আবূ দাউদ : ১১৩৪; নাসাঈ : ১৫৫৬)
১. ঈদুল ফিতর: ঈদুল ফিতর আরবি শব্দ عيد الفطر, অর্থ: “রোজা/উপবাস ভাঙার আনন্দ” দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা ও সামর্থ্যবানদের ফিতরা ও যাকাত আদায়ের পর সাওয়ালের ১ম দিন পালিত ঈদ কে ঈদুল ফিতর বলে।
২. ঈদুল আযহা: ঈদুল আজহা বা ঈদুল আদহা আরবি: عيد الأضحى, অর্থ ‘ত্যাগের উৎসব। এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। আরবি জ্বিলহজ্জ মাসের ১০-১৩ পর্যন্ত আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ ও উট আল্লাহর নামে কোরবানি করাকে ঈদুল আজহা বলে।

মদিনায় প্রথম ঈদ:
এ সম্পর্কে দুটি অভিমত পাওয়া যায়— প্রথমত, আদ-দুররুল মুখতার গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে প্রথম হিজরিতে ঈদের নামাজের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বেশির ভাগ আলেমের মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে তার বিধান প্রবর্তিত হয়। মুসলমানরা মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়ে দ্বিতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ বা ৩১ মার্চ।
এই অভিমতই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রোজা ফরজ হয়। এ হিসাবে দ্বিতীয় হিজরিতেই ঈদের নামাজের বিধান প্রবর্তিত হয়। (মেরকাত শরহে মেশকাত : ৩/৪৭৭; আনওয়ারুল মিশকাত : ৩/৬০৫; আল বিদায়া ওয়ান নেহায়া : ৫/৫৪)

ঈদের সালাত ও পদ্ধতি:
ঈদের নামাজ সূর্যাস্তের পর থেকে জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পড়া যায়। এ নামাজ জামাতের সঙ্গে ঈদগাহে আদায় করা ওয়াজিব।
ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেছেন, ঈদের সালাত প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ একই মত পোষণ করেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে যেতেন।’ (বুখারি)। তবে বিশেষ কারণে ঈদগাহে আদায় করতে না পারলে মসজিদে আদায় করা যায়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একবার বৃষ্টি হওয়ায় মহানবী (সা.) সবাইকে নিয়ে মসজিদে ঈদের সালাত পড়েন।’ (আবু দাউদ) ঈদের সালাত দুই রাকা‘আত। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
صَلاَةُ الْجُمُعَةِ رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ الْفِطْرِ رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ الأَضْحَى رَكْعَتَانِ وَصَلاَةُ السَّفَرِ رَكْعَتَانِ
জুমু‘আর সালাত দু’ রাক‘আত, ঈদুল ফিতরের সালাত দু’ রাক‘আত, ঈদুল আজহার সালাত দু’ রাক‘আত এবং সফর অবস্থায় (চার রাক‘আত বিশিষ্ট ফরয) সালাত দুই রাক‘আত। (নাসাঈ : ১৪২০)
ঈদের সালাতে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর ‘‘আল্লাহু আকবার বলে অতিরিক্ত তাকবীর দিতে হয়। এ বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে :
ক. হানাফী মাযহব মতে ১ম রাকায়াতে ছানার পর ৩টি ও আর ২য় রাক‘আতে রুকুর পর অতিরিক্ত ৩টি মোট ৬ তাকবীর দিতে হয়।
খ. দ্বিতীয় মত হল ১ম ও ২য় রাক‘আতে যথাক্রমে অতিরিক্ত ৭ + ৫ = মোট ১২ তাকবীর। এটি বাকী ৩ মাযহাবের মত।

ঈদের সালাতের আগে করণীয়:
১. গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব।
২. ঈদুল ফিতরের দিন খাবার খেয়ে ঈদের সালাতে যাওয়া, আর ঈদুল আযহার দিন না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। তাছাড়া ঈদুল আযহার সালাত শেষে কুরবানীর মাংস দিয়ে খাবার গ্রহণ করা সুন্নাত।
৩. ঈদগাহে পায়ে হেটে যাওয়া মুস্তাহাব। আর একপথে যাবে এবং ভিন্ন পথ দিয়ে আবার পায়ে হেটেই আসা সুন্নাত।
৪. তাকবীর পড়া এবং তা বেশি বেশি ও উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত তাকবীর দিতে দিতে যেতেন।

ঈদের তাকবীর: ঈদের দিন রাসূল (সা.) যে তাকবীর পড়তে পড়তে যেতেন সেটি হল :
اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ
اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ
অর্থ : আল্লাহ মহান, আল্লাহ অতিমহান, তিনি ছাড়া সত্যিকার আর কোন মা‘বুদ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান আর সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁরই জন্য।

ঈদের খুৎবা: ঈদের খুৎবা শ্রবণ করা মুস্তাহাব। তবে যারা ঈদের খুৎবা না শুনে চলে যাবে তাদের গোনাহ না হলেও তারা ঈদের গুরুত্বপূর্ণ দু‘আ ও ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে।

মোগল সাম্রাজ্যের ঈদ উদযাপন:
মোগল সম্রাটদের ঈদ উদযাপন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও রাজকীয়। ঈদের আগের রাতে চাঁদ দেখা গেলে রাজধানীতে ঢাকঢোল ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা করা হতো। ঈদের সকালে সম্রাট ও রাজপরিবারের সদস্যরা সুসজ্জিত পোশাক পরে ঈদের নামাজে অংশ নিতেন, যা সাধারণত বিশাল ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হতো। এরপর বিশেষ দরবার বসানো হতো, যেখানে অভিজাতরা সম্রাটকে উপহার দিতেন এবং সম্রাটও প্রজাদের মধ্যে দান-খয়রাত করতেন। রাজকীয় ভোজে বিরিয়ানি, শির খুরমা, নেহারি ও নানা সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হতো। এছাড়া হাতি-ঘোড়ার শোভাযাত্রা, আতশবাজি, নৃত্য-সঙ্গীতসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত। বিশেষত আকবর ও শাহজাহানের সময় ঈদ উদযাপন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য, তবে ঔরঙ্গজেব তুলনামূলক সাধারণভাবে ঈদ পালন করতেন। মোগলদের ঈদ ছিল ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ভরপুর এক রাজকীয় উৎসব।

মহান আল্লাহ সবাইকে ইসলামের নির্দেশনা মোতাবেক ঈদ উৎসব উদযাপন করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক:-

মো: তাজুল ইসলাম

অধ্যক্ষ, চান্দিনা জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজ।